পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষক বন্ধু প্রকল্প একটি ব্যাপক কৃষি সহায়তা প্রকল্প যা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে ২০১৯ সালে চালু হয়েছিল।...
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষক বন্ধু প্রকল্প একটি ব্যাপক কৃষি সহায়তা প্রকল্প যা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে ২০১৯ সালে চালু হয়েছিল। এই প্রকল্পটি রাজ্যের কৃষকদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষা বীমা প্রদান করে। ২০২১ সালে এটি পুনর্গঠিত হয়ে "কৃষক বন্ধু (নতুন)" নামে পুনর্চালু হয়েছে, যার ফলে সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৯০ লক্ষেরও বেশি কৃষক এর সুবিধা ভোগ করছেন।২০২৬ সাল অনুযায়ী এই প্রকল্পের মূল বিষয়গুলো নিচে দেওয়া হলো:
আর্থিক সহায়তা প্রদান: কৃষক বন্ধু প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের কৃষি কার্যক্রমে ক্রমাগত আর্থিক সহায়তা প্রদান করা এবং তাদের পরিবারকে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান করা। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন এবং ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কৃষকদের আয়ের অস্থিরতা, ঋণের চাপ এবং দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করছে। সূচনা থেকে এ পর্যন্ত সরকার প্রায় ২৪,০৮৬ কোটি টাকা কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করেছে।
নিশ্চিত আয়ের ব্যবস্থা: কৃষক বন্ধু প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো নিশ্চিত আয় যা কৃষকদের মৌসুমী আয়ের অস্থিরতা থেকে রক্ষা করে। প্রকল্পটি কৃষকদের বছরে দুবার—খরিফ এবং রবি মৌসুমে—সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করে যাতে তারা বীজ, সার, কীটনাশক এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণ ক্রয় করতে পারেন।
জমির আয়তনের ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ নির্ধারিত হয়:
এক একর বা তার বেশি জমির কৃষক: বছরে মোট ১০,০০০ টাকা (প্রতি মৌসুমে ৫,০০০ টাকা)
এক একরের কম জমির কৃষক: বছরে ন্যূনতম ৪,০০০ টাকা (আনুপাতিক ভিত্তিতে, দুই মৌসুমে সমানভাবে বিভক্ত)
এই অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগী কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (ডিবিটি) মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়। এটি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা দূর করে।
বীমা সুবিধা ও মৃত্যু সহায়তা: প্রকল্পটির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মৃত্যু সহায়তা বা ডেথ বেনিফিট, যা কৃষকের পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান করে। ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী যেকোনো নিবন্ধিত কৃষক বা ভাগচাষীর মৃত্যু হলে, তার আইনসম্মত উত্তরাধিকারী বা পরিবারের সদস্যরা এককালীন ২ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা পান। এই বীমা সুবিধার জন্য কৃষকদের কোনো প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে হয় না, যা এটিকে একটি অনন্য সামাজিক সুরক্ষা পদক্ষেপ করে তোলে।
প্রকল্পে অংশগ্রহণের জন্য আবেদনকারীদের নিম্নলিখিত শর্তপূরণ করতে হবে:
প্রাথমিক যোগ্যতা
সফলভাবে আবেদনের জন্য নিম্নলিখিত ডকুমেন্ট প্রস্তুত করতে হবে:
জমির সম্পত্তি সংক্রান্ত সর্বশেষ নথি (RoR/পাট্টা/ফরেস্ট পাট্টা)
পরিচয় প্রমাণ: আধার কার্ড অথবা ভোটার আইডি
আবাসস্থান প্রমাণ: বৈধ পরিচয়পত্র
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: নিজের নামে একটি সক্রিয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (জনধন অ্যাকাউন্ট গ্রহণযোগ্য নয়)
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পাসবুকের প্রথম পৃষ্ঠার ফটোকপি
আধার-ব্যাংক লিংকেজ: ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সাথে আধার কার্ড অবশ্যই যুক্ত থাকতে হবে
ফটোগ্রাফ: পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ফটোগ্রাফ
ওয়ারিশ সার্টিফিকেট: যদি জমির সরাসরি মালিকানা নথি না থাকে তাহলে স্থানীয় পঞ্চায়েতের ওয়ারিশ সার্টিফিকেট
আবেদন প্রক্রিয়া
পশ্চিমবঙ্গ সরকার কৃষক বন্ধু প্রকল্পে আবেদনের জন্য দুটি পথ খোলা রেখেছে - অনলাইন এবং অফলাইন, যাতে সকল স্তরের কৃষক সহজে অ্যাক্সেস পেতে পারে।
অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া
সরকারের অফিসিয়াল পোর্টাল krishakbandhu.wb.gov.in এ প্রবেश করুন
নিবন্ধন করুন এবং একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন
আপনার ইমেইল এবং ফোন নম্বর দিয়ে সাইন আপ করুন
প্রাপ্ত ওটিপি (OTP) নিবন্ধন ফর্মে প্রবেশ করুন
ব্যক্তিগত তথ্য এবং জমির বিবরণ পূরণ করুন
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আপলোড করুন
অফলাইন আবেদন প্রক্রিয়া
আবেদন জমা দেওয়ার পর, সহকারী কৃষি পরিচালক (Assistant Director of Agriculture) নিম্নলিখিত বিষয়গুলি যাচাই করেন:
আবেদনকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের সত্যতা
জমির মালিকানা নথির সত্যতা
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং আধার লিংকেজ
অন্যান্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট
যাচাইকরণ সফল হলে, কৃষক একটি কৃষক বন্ধু কার্ড পান এবং পরবর্তী মৌসুমে আর্থিক সহায়তা প্রাপ্ত হয়।
উপকৃত কৃষক এবং বাস্তবায়ন পরিস্থিতি
বিস্তৃত সুবিধাভোগী ভিত্তি
কৃষক বন্ধু প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গে একটি বিশাল সাফল্য অর্জন করেছে। প্রকল্পের শুরু থেকে ২০২৩-২৪ সালের শেষ পর্যন্ত:
প্রায় ১ কোটি ১ লক্ষ কৃষক খরিফ মৌসুমে ২,৭৬২.৯৪ কোটি টাকা পেয়েছেন
প্রায় ১ কোটি ১ লক্ষ কৃষক রবি মৌসুমে ২,৭৭২ কোটি টাকা পেয়েছেন
২০২৪ সালের খরিফ মৌসুমে ১.০৫ কোটি কৃষক ২,৯০০ কোটি টাকা সহায়তা পেয়েছেন
২০২৪-২৫ রবি মৌসুমে সরকার ১ কোটি ৮ লক্ষ ৯৫ হাজার কৃষক এর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২,৯৪৩ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। প্রকল্পের সূচনা থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৮,১৪৭ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
"দুয়ারে সরকার" ক্যাম্পের মাধ্যমে সম্প্রসারণ
পশ্চিমবঙ্গ সরকার "দুয়ারে সরকার" নামক একটি উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় নিয়মিত ক্যাম্প আয়োজন করে যেখানে কৃষকরা সরাসরি আবেদন করতে পারেন। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই ক্যাম্পগুলির মাধ্যমে প্রায় ৪১ লক্ষ নতুন কৃষক উপকারভোগী যুক্ত হয়েছেন। এই উদ্যোগ বিশেষভাবে দূরবর্তী এবং প্রান্তিক কৃষকদের কাছে পৌঁছাতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ এবং সীমাবদ্ধতা
যদিও কৃষক বন্ধু প্রকল্প ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে, তবুও কিছু চ্যালেঞ্জ বাকি রয়েছে যা কৃষকদের সম্পূর্ণ সুবিধা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
নথিপত্রের সমস্যা
অনেক কৃষক, বিশেষত দরিদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকরা জমির মালিকানার সঠিক নথিপত্র না রেখে থাকেন। যদি কৃষক কাছে RoR বা পাট্টা নথি না থাকে তাহলে তারা প্রকল্পে নিবন্ধন করতে পারেন না। নিবন্ধিত ভাগচাষীদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা অনেক সময় উত্থাপিত হয়, কারণ তাদের মালিক সহায়তা প্রদান করতে অনিচ্ছুক থাকেন।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অ্যাক্সেসের অভাব
অনেক গ্রামীণ কৃষক এখনও এই প্রকল্পের সম্পূর্ণ বিস্তারিত এবং সুবিধা সম্পর্কে সচেতন নন। প্রকল্পটি সম্পর্কে আরও ব্যাপক প্রচারণা এবং সরাসরি জনগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ প্রয়োজন।
সিদ্ধান্তমূলক মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
কৃষক বন্ধু প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের কৃষক সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং যুগান্তকারী উদ্যোগ। এটি কৃষকদের আয়ের নিশ্চয়তা প্রদান করে, তাদের ঋণগ্রস্ততা কমায় এবং তাদের পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান করে। প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রায় লক্ষ কৃষক উপকৃত হচ্ছেন এবং তাদের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে, প্রকল্পটির কার্যকারিতা আরও বৃদ্ধির জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ প্রয়োজন:
নথিপত্র সহজীকরণ: ভাগচাষীদের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া সরল করা এবং যাদের কাছে সঠিক নথি নেই তাদের জন্য বিকল্প পথ খোলা
ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন: গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ এবং ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র সম্প্রসারণ
আধার-ব্যাংক লিংকেজ সহজীকরণ: কৃষকদের জন্য এই প্রক্রিয়াটি আরও সহজ এবং স্পষ্ট করা
সচেতনতা বৃদ্ধি: প্রকল্প সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি
সমন্বিত পরিষেবা: অন্যান্য কৃষি সহায়তা প্রকল্প এবং ঋণদান সুবিধার সাথে একীকরণ
সামগ্রিকভাবে, কৃষক বন্ধু প্রকল্প ভারতের কৃষি খাতে একটি প্রশংসনীয় উদাহরণ হয়ে উঠেছে এবং অন্যান্য রাজ্যের জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করছে। এর সফল বাস্তবায়ন এবং ক্রমাগত উন্নতি পশ্চিমবঙ্গের কৃষি উন্নয়ন এবং কৃষক কল্যাণে একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।

COMMENTS